আমার বিয়ের ৪ মাস পর আমি গিয়েছিলাম আমার হাসবেন্ডের কলিগের বাসায় ঘুরতে। উনার বাসাটা বান্দরবনের একটা অদ্ভুত জায়গায় ছিল। বান্দরবনের অনেক গ্রামের নাম শুনলেও আতীর নামে কোনো গ্রামের নাম শুনিনি। গোগলে অনেক সার্চ দিয়েও এমন নামের গ্রামের সন্ধান পেলাম না। তারা আদিবাসী তাদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি একদম আলাদা। তাই আমি সেখানে যেতে একদম রাজি হচ্ছিলাম না। তবে কলিগের ওয়াইফ সাবিরা ভাবীর জোরাজোরিতে রাজি হই কিছুটা। কেন জানি না আমার একদম মন টানছিল না। কিন্তু আমার হাসবেন্ড নির্ঝরের বক্তব্য প্রকৃতি দেখতে হলে কাছ থেকে দেখতে হয়৷ তবুও কেন জানি না আমার মন খচ খচ করছিল। সেটা বুঝতে না দিয়ে আমি যেতে রাজি হলাম সবার কথায়।
সেখানে যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক হলো। আমি আর আমার স্বামী দুজনেই অফিস থেকে ছুটি নিলাম। অপরদিকে সাবিরা ভাবীর হাসবেন্ড তুশবা ভাইও ছুটি নিলেন। আমরা রওনা দিয়েছিলাম ১৯ তারিখে এবং রোজ বৃহস্পতিবার রাত তিনটেয়। তাই যথাক্রমে বৃহস্পতিবার অফিস থেকে এসে আমি এবং আমার স্বামী কাপড় গুছাচ্ছিলাম। সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার সময় জায়নামাজটাও আমি গুছিয়ে নেওয়ার জন্য আলমিরা থেকে বের করলাম। সাধারণত একটা পাতলা জায়নামাজ আমরা কোথাও গেলে বহন করে নিয়ে যাই। কিন্তু সেদিন জায়নামাজ যতবারেই ব্যাগে নিতে গেছি ততবারেই মনে হচ্ছিল আমার হাতে কেউ শক দিচ্ছে। ততবারেই জায়নামাজটা হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল। কেন জানি না তখনও মনটায় ইতিবাচক কোনো সাড়া পাচ্ছিলাম না। আমি নির্ঝরের কাছে দৌড়ে গিয়ে বললাম
"আমার মন সায় দিচ্ছে না যেতে। তুমি কী কোনোভাবে ট্রিপটা ক্যানসেল করবে? যেখানে যাব সে জায়গা সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। আর যাদের সাথে যাব তারা অন্য জাতের। তাদের সংস্কৃতি আলাদা। পাহাড়ে অনেক সাপও থাকে। তাদের মতো করে আমরা সে জায়গায় সার্ভাইভ করতে পারব না। আমার যেতে একদম ইচ্ছে করছে না।"
নির্ঝর বেশ রাগ গলায় আমাকে উত্তর দিল
"সবসময় তুমি সবকিছুর নেগেটিভ দিক বের করো। ওদের আমরা কথা দিয়েছি যাব। আর আমি তো জানি তুশবা কেমন। ও একদম আমাদের মতো। আমার এবং তার সাথে সম্পর্ক ভালো। তার আন্তরিকতা আমি কীভাবে উপেক্ষা করি। সে তো বলেছেই আমাদের সমস্যা হবে না। নেগেটিভ না ভেবে সবকিছু গুছাও।"
নির্ঝরের কথা শুনে আমি আর কথা বাড়ালাম না। সবকিছু গুছিয়ে নিলাম। তুশবা আর সাবিরা ভাবী মিলেই গাড়ি করেছে। কারণ আমরা তার এলাকা চিনি না। আর বাসে যাওয়ার অভ্যাস আমার নেই। তাই তারা গাড়ি ঠিক করে আমাদের বাসার সামনে আসলো রাত আড়াইটায়। তখনও আমার মন খচখচ করছিল। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে কিছুটা হেসে তাদের কাছে গেলাম। আমি আর নির্ঝর এবং সাবিরা ভাবী পেছনে বসলাম আর ড্রাইভার আর তুশবা বসলো সামনে। যার গাড়ি ভাড়া করেছে সেও তাদের জাতের। তাদের মধ্যে কী কথোপকথন হচ্ছে আমি বা নির্ঝর কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
গাড়িতে উঠার ১০ মিনিট পর গাড়িটা ছাড়ল। গাড়িতে উঠেই আমার মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগল। অসম্ভব মাথা ব্যথা শুরু হলো আমার। মাথার ব্যথায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম আমি। কখন যে আমি ঘুমিয়ে তলিয়ে গিয়েছি জানি না। তবে ঘুম থেকে উঠে এক অদ্ভুত বিষয় আমি আবিষ্কার করলাম।
তুশবা আর সাবিরা র/ক্ত বমি করছে। প্রথমে ঘুম থেকে উঠে গাড়িটা শূন্য দেখে আমার ভেতরটা কেঁপে উঠে৷ এরপর গাড়ির বাইরে থেকে একটা শব্দ কানে ভেসে আসলো। সেখানে গিয়ে খেয়াল করলাম তুশবা আর সাবিরার নাক মুখ দিয়ে ব্লা/ড যাচ্ছে। নির্ঝর আর গাড়ির ড্রাইভার সেখানে অনুপস্থিত। মোবাইলের স্ক্রিন অন করে খেয়াল করলাম ৪ টা ৫৩ বাজে। গরমের রাত তো। রাতটা বেশ বড়ো। রাস্তা ফাঁকা থাকায় আমরা হয়তো দ্রূত ঢাকা থেকে বের হয়ে এসেছি। কারণ এ জায়গাটা একদম চেনা লাগছে না। কিছুটা আবছা জঙ্গলের মতো। ঘুটঘুটে অন্ধকারেই থাকত। কেবল গাড়ির হেড লাইটের জন্য অন্ধকারটা বুঝা যাচ্ছে কম। মোবাইলে এক বিন্দু নেটওয়ার্ক নেই যে নির্ঝরকে কল দিব। তুশবা আর সাবিরার অবস্থা দেখে আমার ভীষণ হাত,পা কাঁপছে। আমি কিছু বলার বোধ শক্তি পাচ্ছি না।
কিছুক্ষণ স্তব্ধতার মধ্যেই কাটল। তারপর লক্ষ্য করলাম নির্ঝর আর ড্রাইভার কোথায় থেকে যেন ছুটে আসতেছে। হাতে কিছু লতাপাতা নিয়ে। আমি নির্ঝরকে দেখে কিছুটা শক্তি পেলাম। আমি কিছুটা দ্রূত গলায় বললাম
"নির্ঝর তুমি কোথায় গিয়েছিলে? আর হাতে এসব কী? তুশবা ভাইয়া আর সাবিরা ভাবি রক্ত বমি করছে।"
নির্ঝর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল
"ওদের কী যেন হয়েছে। তুশবা বললো এই জঙ্গল থেকে এ লতাপাতাগুলো এনে ওদের যদি রস করে খাওয়ায় তাহলে ওদের এ বমি কমে যাবে। তাই আমি আর গাড়ির ড্রাইভার মিলে এ লতাপাতা গুলো আনতে গিয়েছিলাম। একা গেলে চিনব না তো তাই ড্রাইভারকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম। তুমি ঘুমাচ্ছিলে তাই তোমাকে ডাকিনি। এখন রস করে খাওয়াব।"
নির্ঝরের এমন আজব আজব কথায় আমি অনেকটা অবাক হলাম। নির্ঝর এমন উদ্ভট কথা কেন বলছে! ডাক্তারের কাছে না গিয়ে এসব করছে কেন? আমি নির্ঝরকে কিছু বলার আগেই সে এবং ড্রাইভার মিলে লতাপাতা গুলো হাত দিয়েই চিপে চিপে রস বের করে তুশবা আর সাবিরাকে খাওয়ালো। সাথে সাথেই তাদের র/ক্ত বমি বন্ধ হয়ে গেল। আমার বিস্ময়ের গতি বাড়তে থাকল। এ সময় এত তাড়াতাড়ি আমি ঢাকা থেকে কীভাবে এখানে আসলাম? ঘন্টা দেড়েকে গাড়ি এত নিস্তব পাহাড়ী জায়গায় বা কেন পড়লো? এলোমেলো ভাবনা আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
নির্ঝর আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলল
"নিশিতা গাড়িতে উঠো। তুমি, তুশবা আর ভাবী পেছনে বসো আমি সামনে বসছি। আর ভাবী আর ভাইয়ার দিকে একটু খেয়াল রেখো।"
আমার ভীষণ ভয় লাগতে শুরু করলো। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে প্রথমে আমি তারপর সাবিরা এরপর তুশবা উঠল। আর নির্ঝর সামনে বসলো। রাতের চাঁদটা লাল হয়ে আছে। মনে হচ্ছে এখনই অস্ত যাবে। চাঁদটার দিকে তাকিয়ে আছি আমি। গাড়িটা চলতে শুরু করল। বারবার কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ কানে আসতে লাগল আমার। এ শব্দটা কখনও ক্ষীণ হচ্ছে কখনও প্রখর। আমি নির্ঝরকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম
"কুকুরের ডাক শুনছো তুমি? কোথায় যেন মনে হচ্ছে কুকুর ডাকছে। শব্দটা গাড়ি চলার সময় যে শুরু হয়েছে এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি। কোনো কুকুর কী গাড়ির পিছু নিয়েছে কি'না বুঝতেছি না।"
নির্ঝর হালকা গলায় বলল
"নিশিতা তুমি কেমন জানি অদ্ভুত কথা বলো। তোমার কী কিছু নিয়ে হ্যালুসিনেশন হচ্ছে? আমার তো মনে হয় তাই হচ্ছে তোমার। আমি তো কোথাও কুকুরের ডাক শুনছি না। এগুলো তোমার মনের মতিভ্রম।"
আমি কেবল হুম বলে কথার সমাপ্তি ঘটালাম। সরু রাস্তা দিয়ে গাড়িটা এগিয়ে যাচ্ছে। ক্রমশও আলো ফুটার পরিবর্তে অন্ধকার হচ্ছে চারপাশ। পাশ থেকে কেমন যেন শব্দ আসছে। মনে হলো তুশবা আর সাবিরার কিছু একটা হয়েছে। আমি বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে তাদের দিকে তাকালাম। দুজনেই নীচের দিকে তাকিয়ে হাঁপাচ্ছে। আমি সাবিরার কাঁধে ধরে হালকা গলায় জিজ্ঞেস করলাম
"তোমার কী কষ্ট হচ্ছে?"
সাবিরা আমার দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো রক্ত বর্ণ হয়ে আছে। আমি কিছুটা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম
"তোমার কি বেশি খারাপ লাগছে? চোখে কিছু হয়েছে?"
সাবিরা আমার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত একটা হাসি দিল। তার দাঁত দিয়ে র/ক্ত ঝড়তেছে। সে সাথে চোখ দিয়েও র/ক্ত ঝড়তেছে। ভয়ংকর হয়ে উঠছে তার চেহারা। আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে লাগল। একটা চিৎকার দিতে চেয়েও দিতে পারছিলাম না। অনেক কষ্ট করে জোরে একটা চিৎকার দিলাম। চোখটা বন্ধ করে পরক্ষণে খুলেই নিজে চমকে উঠলাম। নির্ঝর আমার চোখে মুখে পানি দিচ্ছে। চারপাশটা বেশ আলোকিত। আমি অবাক হয়ে নির্ঝরের দিকে তাকালাম। পাশেই তুশবা আর সাবিরা ভাবী বসা। তারা উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করল
"ঠিক আছেন ভাবী? আপনার হঠাৎ করে জ্ঞান চলে গিয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম ঘুমিয়ে গেছেন। সকাল হলো ঢাকাও পার হলাম। নাস্তা খেতে নামতে গিয়ে আপনাকে ডাকলাম সাড়া দিচ্ছিলেন না৷ ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এখন কী একটু ভালো লাগছে?"
সাবিরার কথা শুনে আমি কিছুটা অবাক হলাম। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম ব্যস্ত রাস্তা। সবকিছু ঠিকঠাক। আমি হয়তো অতিরিক্ত চিন্তায় এসব স্বপ্নে দেখেছি। এমন কেন লাগছে জানি না। চুপ হয়ে এসব ভাবতেই লাগলাম। নির্ঝর আমাকে আস্তে গলায় জিজ্ঞেস করল
"তুমি ঠিক আছো তো? শরীর কেমন লাগছে?"
আমি ভাবনার অতল গহ্বর থেকে বের হয়ে এসে উত্তর দিলাম
"হ্যা ঠিক আছি।"
এরপর স্বাভাবিক হয়েই তাদের সাথে নামলাম নাস্তা করতে। নামার পরপরই অদ্ভুত একটা অনুভুতি আমাকে ঘিরে ধরল। সে সাথে অলৌকিক কিছু যেন আমাকে ডাকতে লাগল। আর....
👉 লেখিকা #শারমিন_আঁচল_নিপা
