বিয়ের ৪ বছর পর স্বামির পকেট এ হাত দিয়ে ছিলাম। টাকা নেইনি। শুধু দেখেছিলাম টাকা আছে কিনা? তাতেই শুনতে হলো তার পকেটে আমি কেন হাত দেবো?
কথাটা শুনে আমি সেইখানে জমে গেলাম। মনে হলো এই চারবছরের সংসারে এই কি পাওনা ছিল আমার?
স্বামীর মুখে এই কথাটা শুনে শাশুড়ী মা দৌড়ে এলেন আমাদের ঘরে এসে চিৎকার করে বললেন, কি হয়েছে বাবা সাফোয়ান? নিরা আবার কি করেছে? টাকা চুরি করেছে নাকি তোর পকেট থেকে?
আমি আগেই তোর বাবাকে বলেছিলাম এই ছোটলোকের মেয়েকে ছেলের বউ না করতে। কিন্তুু তিনি তো কথা শুনার বান্দা না। কত টাকা নিয়েছে বাবা?
শাশুড়ী মায়ের কথা শুনে আমি সাফোয়ানের মুখের দিকে তাকালাম। বিয়ের এতদিন হয়ে গেছে কিন্তুু এখন পর্যন্ত এই বাড়ির একটা সুই পর্যন্ত আমার বিনা অনুমতিতে ধরার অধিকার নেই। রান্নার জন্য চাল, তরি-তরকারি, মসলা, তেল শাশুড়ী বের করে দেয় আমি রান্না করি। তারপর শাশুড়ী তার ইচ্ছামতো সবাইকে খাবার বেড়ে দেয়। আবার আমার জামা-কাপড় আজ পর্যন্ত আমার পছন্দ মতো কখনো নিতে পারিনি। জামা ছিড়ে গেলে শাশুড়ী কে বলতে হয় তারপর তিনি এনে দেন। ভাববেন না এই নিয়ম টা শশুর-শাশুড়ী করেছে।
না এটা আমার স্বামীর নিয়ম৷ কারণ তার মাকে তার দাদী অনেক কষ্ট দিছে এখন তাই তার মাকে কোনোরকম কষ্ট দিতে চায় না। আমিও চুপচাপ সব মেনে নিছি। শশুরমশাই অবশ্য কখনো কিছু বলতেন না।তিনি বরাবরই শান্ত স্বভাবের মানুষ।
সাফোয়ানের দিকে তাকানো দেখেই সাফোয়ান বললো, তাকাচ্ছো কেন এইভাবে? আমাকে কি নতুন চেনো? জানোই তো আমি আমার জিনিস, টাকা-পয়সায় অন্য কারো হাত দেওয়া মেনে নিতে পারি না।
আমি ঘৃণা,লজ্জায় মাথা নিচু করলাম। তারপর দৌড়ে ঘরের বাইরে যেতে লাগলাম তখনি সামনে এসে দাঁড়ালো আমার বাবা। চোখে মুখে প্রচন্ড রাগ।
আমার হাত ধরে টেনে ঘরে এনে আমাকে প্রশ্ন করলো, সাফোয়ানের পকেটে কেন হাত দিয়েছিলে?
আমি বাবার এরকম গলা শুনে ভয় পেয়ে গেলাম। এই প্রথম বাবাকে আমি এরকম রাগতে দেখলাম।
আমি বললাম, আসলে........আমার....
আমি আর কিছু বলার আগেই সাফোয়ান বললো, আপনার মেয়ের মাথায় দেওয়া তেল শেষ হয়ে গেছে। মাকে বলেছে। মা নাকি কয়েকদিন পরে এনে দিতে চেয়েছে কিন্তুু তার এখনি লাগবে তাই আমাকে বলছিল। আমি বারবার বলছিলাম খুচরা টাকা নেই কিন্তুু সে শুনছে না সে গিয়ে আমার পকেট দেখতে গেছে টাকা আছে কি না?
সাফোয়ানের কথা শুনে শাশুড়ী মা মুখ বাকিয়ে বললেন, দেখছেন বেয়াই আপনার মেয়ের সাহস। আমি তো বলেছিলাম দুইদিন পর এনে দিবো কিন্তুু সে এসে আমার ছেলের সাথে জিদ ধরেছে। বলি বউ কি আমরা ছিলাম না মেয়ে? কতদিন গেছে মাথায় তেল দেই নি তাতে কি আমরা ম/রে গেছি?
সাফোয়ান আর শাশুড়ীর কথা শুনে আমার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। বাবার দিকে তাকাতে আমার লজ্জা করছে। ছি শেষ পর্যন্ত এইভাবে বাবার সামনে আমাকে অপমানিত হতে হলো?
বাবা এইবার আমার কাছে আসলেন তারপর বললেন, নিরা যা শুনছি তা কি ঠিক?
আমি কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ালাম।
বাবা আমার কথা শুনে বললো, তুমি ভুল করেছো নিরা।
বাবা এতটুকু বলতেই শাশুড়ী মা বললেন, হ্যা বেয়াই মেয়েকে একটু বোঝান। আমরা তো তার কোনো অভাব রাখি না। এত ধৈর্য হারা হলে চলবে?
বাবা এইবার বেশ জোড়েই বললেন, চুপ করুন আপনি। আমাকে আমার মেয়ের সাথে কথা বলতে দিন। নিরা তুমি ভুল করেছো। এই যে চার বছর হলো তোমাদের বিয়ের এতদিনেও তুমি স্ত্রীর পুরোপুরি মর্যাদা পাও নি এটা তোমার বাবাকে না জানিয়ে ভুল করেছো। স্বামীর পকেটে হাত দেওয়ার জন্য যদি তোমাকে চোর অপবাদ নিতে হয় আমার মনেহয় না সেই বাড়িতে তোমার থাকার কোনো দরকার আছে। আর যাই হোক দুটো ভাত - কাপড়ের জন্য তোমাকে এই সংসারে মান -সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে থাকতে হবে না৷
বাবার কথা শুনে শাশুড়ী মা বললেন, বাহ বাহ বেয়াই আপনি আপনার মেয়েকে শাসন করবেন কি না তার বদলে আরো কথা শুনাচ্ছেন আমাদের? দেখ বাবা দেখ এইজন্যই তোর বউয়ের এত বড় সাহস৷
সাফোয়ান রাগ করে বললো, আচ্ছা তাই নাকি এইখানে আপনার মেয়ের মান -সম্মান ধুলোয় মিশে গেছে? তাহলে নিয়ে যান। রাখুন আপনার মেয়েকে ঘরে সুকেসে তুলে।
আমিও দেখি আপনার কত ক্ষমতা। আমার কাছ থেকে নিয়ে গিয়ে কেমন সম্মানের সাথে রাখতে পারেন।
বাবা হাসলেন আর বললেন, আর যাই হোক চোর অপবাদ শুনতে হবে না সাফোয়ান। আর তোমাকে চিনতে আমি এত ভুল করেছিলাম ভাবতেও আমার লজ্জা লাগছে। যাইহোক আমি তোমার মতো মানুষের কাছে আমার মেয়েকে রাখবো না। নিরা চলো।
এই বলেই আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগলো। আমি কি বলবো বুঝতে পারলাম না সাফোয়ান ও চুপচাপ মুখ ঘুড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আর শাশুড়ী নানা কথা বলে চিৎকার করছেন। বাবা আমাকে নিয়ে বাড়ির গেট থেকে বের হতে যাবে তখনি শশুরমশাই এসে বললেন, একি বেয়াই বৌমাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন? কি হয়েছে? আপনাকে দেখে এরকম কেন লাগছে?
চলবে.........
গল্পঃ #সুখপাখি
লেখিকাঃ #মিশু
পর্বঃ (১)
