#লোভ
#৩য়_পর্ব
#অনন্য_শফিক
'
'
'
পরদিন সকাল হতেই অফিস বাদ দিয়ে কুমিল্লার পথ ধরলাম আমি।তনুর বাবার বাড়ি যাবো। কুমিল্লা শহরের পাশেই তনুদের বাড়ি। ওদের বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটের পথ ওদের মামা বাড়ির।এক পাড়াতেই ওরা থাকে। ভাবলাম এই সুযোগে সব তথ্য নিয়ে আসা যাবে। ছোট মামীর কাছ থেকে সব জানা যাবে।আর তনু কী মিথ্যে বলছে নাকি ওই মহিলা তাও জেনে ফেলা যাবে।তনু সত্য বললে তো সে তাদের বাড়িতে থাকবেই। মিথ্যে বললে থাকবে না। গিয়ে তাকে পাবো না। তখনই তো সব প্রমাণ হয়ে যাবে।
কিন্তু এর মধ্যেই অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো। তনুর নম্বর থেকে কল এলো। তার গলা ভেজা। সে বললো,' ভয়াবহ একটা ঘটে গিয়েছে তমাল।'
আমি বললাম,' কি হয়েছে? '
কথা শেষ করতে পারলো না। এরমধ্যে ফোন কেটে গেল।আমি আবার ফোন করলাম এখান থেকে।তনু রিসিভ করলো না।কি হয়েছে কিছুই বুঝতে পারছি না।
একটু পর সে-ই নিজ থেকে ফোন করলো। তাড়াহুড়োর গলায় বললো,' ছোট মামী ভয়াবহ ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে।'
আমি বললাম,' আরে ভাই খুলে বলো তুমি।সেই কখন থেকে বলতেছো ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেটা কি! কি করেছেন মামী?'
তনু বললো,' ফাঁ*সিতে ঝুলে গিয়েছিলেন।মারা যাননি অবশ্য।আমরা ভেবেছিলাম মারাই গিয়েছেন। কিন্তু হসপিটালে নেয়ার পর বোঝা গেল এখনো বেঁচে আছেন। কিন্তু অবস্থা সংকটাপন্ন। ডাক্তার বললো, বাঁচার সম্ভাবনা নাই বললেই চলে।আমি হসপিটালেই আছি। মামীর সঙ্গে।'
আমি চমকে উঠলাম একেবারে।গা শিউরে উঠলো আমার একেবারে।এটা তো কিছুতেই স্বাভাবিক বিষয় না!
আমার সবকিছু কেমন গোলমেলে হয়ে পড়েছে।
তনু কী তবে চট্রগ্রাম যায়নি? গিয়ে থাকলে মামীর সঙ্গে সে এখন হসপিটালে কীভাবে? তাছাড়া ছোট মামী গতকাল শেষবার বলেছিলেন, আমায় নিয়ে কি একটা গোপন খেলা চলতেছে। এই কথা বলার ঠিক একদিন পাড় না হতেই কিভাবে ছোট মামী ফাঁ*সিতে ঝুলে যেতে পারেন? তিনি কেন ফাঁ*স নিবেন? কি এমন কারণ আছে এর? নাকি তিনি নিজ থেকে ফাঁ*স নেননি? তাকে অন্য কেউ ঝুলিয়েছে?
'
আমি গাড়িতে চড়ে কুমিল্লার দিকেই যেতে থাকলাম। ওখানে গিয়ে হয়তো অনেক কিছুই আঁচ করা যাবে। কিন্তু মামী যদি মরে যান! তনু তো বললো, বাঁচার সম্ভাবনা নাই!
খুব খারাপ লাগছে আমার। মামীর বেঁচে থাকাটা খুব প্রয়োজন।কারণ , আমার মনে হচ্ছে মামীর এই ফাঁ*সিতে ঝুলে যাওয়ার পেছনে বড় কোন কারণ আছে। এবং ওখানে আমিও জড়িত। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে মামী নিজে নিজে এই কাজ করেননি।
আমি মনে মনে আল্লাহকে ডাকলাম। বললাম, হে মহান মালিক, তুমি উনাকে বাঁচিয়ে দাও। সুস্থ করে দাও।
এরপর গাড়িতেই হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়লাম।ঘুম ভাঙলো তনুর ফোনে।তনু ফোন করে বললো,' তুমি কোথায়?'
আমি বললাম,' গাড়িতে।'
' গাড়িতে কেন?'
আমি বললাম,' আসতেছি। এতো বড় বিপদ।আসতে হবে না!'
তনু খানিকটা সময় চুপ করে রইলো। তারপর বললো,' ঠিক আছে আসো।আর শুনো।'
আমি বললাম,' হুমম।বলো।'
তনু বললো,' ফাঁ*সিতে ঝুলে যাওয়া ব্যক্তি কী কখনো বেঁচে যায়? বাঁচার সম্ভাবনা থাকে?'
আমি ইচ্ছে করেই মিথ্যে একটা উত্তর দিলাম। বললাম,' নাহ। বাঁচে না।'
তনু বললো,' তুমি কী ভালো করে জানো এটা? আমার খুব খারাপ লাগছে।মামী আমার বন্ধুর মতো।সম বয়সী আমরা।মামা মালয়েশিয়া গেলেন আজ সাত বছর। ফেরার নাম নাই। মামীর সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নাই। একটা মেয়ে রেখে গেল।ওরে নিয়ে মামী একা একা সংসার সামলাচ্ছেন। মামীর জন্য বড় খারাপ লাগছে।মামী না থাকলে মেয়েটার কি হবে বলো?'
বলে তনু কান্নায় ভেঙে পড়লো ফোনেই।
আমি ওকে সান্তনা দিলাম। বললাম,' সব আল্লাহর ইচ্ছা। দোয়া করো। কান্নাকাটি করে তো লাভ নাই তনু!'
তনু হঠাৎ রেগে গেল।রেগে গিয়ে বললো,' তুই কি বুঝবি কষ্ট! তোর তো কেউ না । আমার মামী মরতেছে। আমার কাছের মানুষ মরে যাইতেছে!'
আমি কথা বললাম না।নিজে থেকেই ফোন কেটে দিলাম।
ফোন কেটে দিয়ে মনে মনে ভাবলাম, তনুর এই কান্নাকাটি। তার এতো দরদ মাখা কথাবার্তা। আহাজারি। রাগারাগী। এইসব খুব সন্দেহজনক। আচ্ছা সে নিজেই আবার মামীর ফাঁ*সির বিষয়টার সঙ্গে জড়িত না তো?
'
গাড়িতে থাকা অবস্থায়ই আশফাক স্যারের স্ত্রী দাবি করা মহিলা আবার আমায় ফোন দিলো।আমি রিসিভ করলাম না। কিন্তু পর পর তিনবার কল দিলে আমি রিসিভ করে রাগের গলায় বললাম,' সমস্যা কী? আপনি কল দিচ্ছেন কেন?'
মহিলা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো। বললো,' অবশেষে আপনার স্ত্রী আমার স্বামীরে ছাড়লো । বুড়ো, শারীরিক দূর্বল একটা লোকের জন্য আপনার স্ত্রীর ঘরছাড়ার কারণ টা কী ভাবছেন আমি বুঝি না? সব বুঝি।টাকা কামাচ্ছেন। সুন্দর বউ দিয়ে বে*শ্যা বৃত্তি করাচ্ছেন।তাও সামান্য কাস্টমার ধরেননি।টাকার কুমির ধরেছেন! কিন্তু শুনে রাখেন তমাল সাহেব।আমি আপনাদের জন্মের শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো। এমন শিক্ষা দিবো যে সারাটা জীবন অন্ধকারে কাটাতে কাটাতে চব্বিশ ঘন্টা আমার নাম মনে করবেন!'
তার যা বলার একসাথে সব হড়বড় করে বলে গেল।আমি শুধু শুনলাম। হ্যাঁ না কিছুই বললাম না। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে, এই কম বয়সী মেয়ে লোকটি আসলেই আশফাক স্যারের স্ত্রী ।হতে পারে স্যার একাধিক বিয়ে করেছেন। এই বিয়েটা হয়তো খুব বেশিদিন আগে করেননি।
কিন্তু এই মহিলা আমায় দোষারোপ করছে কেন এভাবে? সে এটা কিভাবে ভাবতে পারলো, একজন স্বামী তার নিজের স্ত্রীকে অন্য একটা পুরুষ লোকের কাছে তুলে দিবে?
'
গাড়ি থেকে নেমেই আমি ফোন করলাম তনুকে। তনু ফোন রিসিভ করলো সঙ্গে সঙ্গেই।আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোন হসপিটালে ওরা আছে?
সে বললো, আল আরাফাহ হসপিটাল।
আমি সঙ্গে সঙ্গে অটো করে ওখানে চলে গেলাম। গিয়ে দেখি ওখানে তনুর মামা বাড়ির অনেকেই আছে। আমার শশুর শাশুড়িও এখানে।
তনু আমাকে দেখেই এক রকম দৌড়ে এসে আমায় জড়িয়ে ধরল।ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো,' মামী কেন এমন করলো তমাল? জানো মামী আইসিইউতে আছে। বাঁচার আশা নাই তমাল!'
আমি ওর পিঠে একটা হাত রাখলাম।ওর মামীর এমন দুরবস্থায় সে কাঁদবে এটা ভুল না। দোষ না। কিন্তু এই কান্নাটা আমার ভেতরে দুঃখ জাগাতে পারছে না কেন?
আমি তা বুঝতে পারছি না।
'
#চলবে
