গপ্পোবাজ একটি গল্প প্ল্যাটফর্ম, যা বিভিন্ন লেখকদের গল্প সমূহ পাবলিশ করে । প্রতিটি গল্পের মূল সত্বাধিকারী লেখক নিজেই । আমরা পাঠকদের চাহিদা মোতাবেক গল্পসমূহ পাবলিশ করে থাকি । কোনো গল্পের জন্য গপ্পোবাজ প্ল্যাটফর্ম দায়াবদ্ধ নয়। ধন্যবাদ।

চড়ুই পাখি


 


স্টাফ রুমে ঢুকেই মনিকা ম্যাম হৈ হৈ করে উঠলেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন, 'সব ক'টা বেয়াদব। পিটিয়ে ছাল তুলে দিতে পারলে ভালো হয়। কোন পরিবার থেকে এরা আসে কি জানি!' 

 মনিকা ম্যাম অল্পেতেই রেগে যান। এটা তার জন্মগত স্বভাব। স্কুলে ছাত্রীদের সবচেয়ে বকাঝকা তিনিই বেশি করেন। কিন্তু স্টাফর রুমে এসে এভাবে রিয়াক্ট করেন না। অন্তত আজ যা করলেন। বয়োজ্যেষ্ঠ কবিতাদি তিন-চারটি চেয়ার পার হয়ে এগিয়ে এলেন। 

মনিকা ম্যামের সামনে দাঁড়িয়ে হাসলেন। শেষে ব্যঙ্গ করে বললেন, 'তোর চিৎকারের স্বভাব গেল না। আগে ক্লাসরুমে করতি এখন শুরু করলি এখানে। ছাত্রীরা একটু ভুল করলেই মেজাজ সপ্তমে তুলে ফেলিস। বয়স হয়েছে। রাগ একটু কমা।' 

 মনিকা ম্যাম হাতের সাদা রুমালে কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে মেজাজ তারসপ্তকে চড়িয়ে বললেন, 'কি সাহস ভাবুন আপনি! ক্লাস ফাইভে পড়ে। বইয়ের লেখা দেখিয়ে বলছে ভুল! কত বড় পন্ডিত হয়েছে ভাবুন! মনে হচ্ছিল চড়িয়ে গালটা ফাটিয়ে দি।' 

 কবিতা ম্যাডাম আরেকবার নতুন করে হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন, 'বইয়ের লেখা ভুল বলছে! বলো কি! আশ্চর্য! কে?' আর বলবেন না! ফাইভে পড়ে, শেষ বেঞ্চে বসে, অদ্রিজা! ও তো পড়াশোনায় ভালো! আশ্চর্য! কি ভুল বলছে? 

মনিকা ম্যাম বিরক্ত হলেন। চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন, আর বলবেন না। জি কে ক্লাস ছিল। পড়াচ্ছিলাম পৃথিবীতে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হল মানুষ। এটা শুনেই অদ্রিজা হাত তুলে বই নিয়ে এসে বলল, ম্যাডাম সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ না। চড়ুই পাখি। বইতে মানুষ লিখে ভুল করেছে। কখনোই মানুষ হবে না। বিরক্ত লাগে না বলুন? কত বড় বেয়াদব মেয়ে! বইতে লেখা আছে দেখছে তবু বলছে ভুল লেখা। কি করতে ইচ্ছা করে? দিয়েছি গালে ঠাস করে একটা! 

 বিপাশা ম্যাম এতক্ষণ চুপ করে বসে ঝিমুছিলেন। হঠাৎ জেগে ওঠে উৎসাহিত হয়ে অনুচ্চসরে ফিসফিস করে বললেন, 'বাবা মার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে সেই মেয়েটা তো! দিদার কাছে থাকে। আরে বাজারের পেছনে। চিনিস না! আরে ওই যে! বাচ্ছা মেয়েটাকে ফেলে বাবা মা দু'জনেই পালিয়েছে।

 বিপাশা ম্যামের কথায় মনিকা ম্যাম তেমন উৎসাহ দেখালো না। অর্থাৎ এ ঘটনাটা তিনিও জানেন। কবিতা ম্যাম সম্ভবত জানতেন না। তিনি চোখ বড় বড় করে বললেন, বলিস কি! জানতাম না তো! বিপাশা উৎসাহ পেয়ে ঝড়ের গতিতে বলল, শুনেছি ওর বাবা অন্য একটা বউ নিয়ে পালিয়েছে। পরে মা - টাও গেছে। একেবারে বাজে পরিবার। বাচ্চাটার কথা কেউ ভাবলো না। 


 কিছুদিন হলো সঞ্চিতা ম্যাম এ স্কুলে জয়েন করেছেন। মালদার রতুয়া থেকে সদ্য ট্রান্সফার নিয়ে এসেছেন। ঘটনার বিন্দু বিসর্গ তিনি জানতেন না। স্টাফ রুমের আলোচনা সমস্ত মনোযোগ দিয়ে শুনলেন, তারপর টিফিন বেলা মেয়েটিকে খুঁজতে বেরোলেন। ফাইভ সি সেকশনে এসে দেখলেন, একটি মেয়ে ফ্যান অফ করে এক মনে অংক করছে। ঘরের লাইট দুটোও বন্ধ। ধীরে ধীরে সঞ্চিতা ম্যাম মেয়েটির কাছে এলেন। পাশে বসলেন। 

তারপর হেসে বললেন, কিরে গরম লাগছে না! লাইট ফ্যান অফ করে রেখেছিস কেন? 

 অদ্রিজা অংক বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হেসে বলল, ঘরে তো আমি একাই আছি ম্যাম। সবাই আসুক চালিয়ে দেব। শুধু শুধু কারেন্ট পুড়িয়ে লাভ নেই। 

 ম্যাম অদ্রিজাকে বসতে বললেন। তবু অদ্রিজা বসলো না। দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটির কথায় ম্যাম অবাক হলেন। মেয়েটিকে ভালো করে দেখে একটু থেমে তিনি বললেন, তুমি নাকি ম্যামকে বলেছ বইতে ভুল লেখা আছে! ওরকম বলছ কেন? অদ্রিজা এবার কেমন যেন একটা ভাবনায় পড়ল। একটু চিন্তা করলো। শেষে উদাসী হয়ে বলল,

 ঠিকই বলেছি ম্যাম। বইতে ভুলই লেখা আছে। মানুষ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী নয়। চড়ুই পাখি সবচেয়ে বুদ্ধিমান। 

 সঞ্চিতা ম্যাম এবার হাত ধরে অদ্রিজাকে বসিয়ে আবার আদর করে বললেন, পাখিও বুদ্ধিমান। কিন্তু মানুষ তার চাইতে বুদ্ধিমান। অদ্রিজা ম্যামের কথায় অবাক হলো। চোখে মুখে অবিশ্বাসের ভাব ফুটিয়ে জেদের সঙ্গে বলল, 

না ম্যাম, চড়ুই পাখি বেশি বুদ্ধিমান। আমি দেখেছি। 

 সঞ্চিতা ম্যাম অদ্রিজার কনফিডেন্স থেকে অবাক হলেন। একটু বিরক্তও হলেন। তবু যথাসম্ভব শান্ত স্বরে বললেন, 

 কি দেখেছো তুমি? 

 অদ্রিজা এবার উৎসাহ নিয়ে চোখ গোল গোল করে হাত নেড়ে বলল, আমাদের পাশের বাড়ির ঘুলঘুলিতে চড়ুই পাখি বাসা বেঁধেছে। ছোট ছোট ছানা হয়েছে। ছানা দুটো চোখে দেখতে পায় না। শুধু সারাদিন হাঁ করে থাকে। ওর বাবা-মা কি সুন্দর ছোট ছোট পোকা ধরে এনে বাচ্চাদের মুখে দিচ্ছে। ছানা দুটো কি সুন্দর খাচ্ছে। খাওয়া হয়ে গেলে চড়ুই পাখি বাচ্চাদের খুব আদর করছে। আমি দেখেছি ম্যাম!আমি দেখেছি। 

 সঞ্চিতা ম্যাম মাথা নিচু করে এতক্ষণ শুনছিল অদ্রিজার কথা। হঠাৎ কি মনে হতে তাকিয়ে দেখলো মেয়েটির চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে। মেয়েটি বা হাতে চোখের জল মুছে আবার কিছু বলার চেষ্টা করছে। একটু থেমে দম নিয়ে চোখ মুছে অদ্রিজা আবার বলল,

আমারও তো বাবা মা আছে, আমিও সারাদিন তাকিয়ে থাকি। জানো ম্যাম! কেউ আমার জন্য খাবার নিয়ে আসে না। আদর করতে আসে না। খিদে পেলে কাউকে বলতে পারিনা। 😥😥

বলেই অদ্রিজা হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো আর বলতে লাগলো, ওরা অনেক বুদ্ধিমান, ওরা অনেক বুদ্ধিমান। মানুষ বুদ্ধিমান নয়। কক্ষনো মানুষ বুদ্ধিমান নয়। সঞ্চিতা ম্যাম উঠে গিয়ে অদ্রিজাকে বুকে টেনে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর অনুভব করলেন তারও চোখ দুটোও ভিজে গেছে জলে। বড় কষ্টের সে জল। বড় বেদনার সে জল।😥


BabuRam

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.