গপ্পোবাজ একটি গল্প প্ল্যাটফর্ম, যা বিভিন্ন লেখকদের গল্প সমূহ পাবলিশ করে । প্রতিটি গল্পের মূল সত্বাধিকারী লেখক নিজেই । আমরা পাঠকদের চাহিদা মোতাবেক গল্পসমূহ পাবলিশ করে থাকি । কোনো গল্পের জন্য গপ্পোবাজ প্ল্যাটফর্ম দায়াবদ্ধ নয়। ধন্যবাদ।

আমীরা পর্ব ৪+৫

#আমীরা 
#পর্ব- ৪
#শারমিন আঁচল নিপা
এবার আমার মাথায় মনে হচ্ছে কোনো পাথর চেপে ধরে রেখেছে।  খুব খারাপ লাগছে। হালকা বমি ভাব আসছে, তবে বমি হবে বলে মনে হচ্ছে না। আমি এবার ঘুমাতে চেয়েও পারছিলাম না। সাবিরা আবারও আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, 
"ভাবী খারাপ লাগছে আবার?"
আমি কেবল মাথা ঝাঁকালাম। অন্যদিকে তুশবা আর নির্ঝর প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। তবে আমি চাইলেও সেটা উপভোগ করতে পারছিলাম না।  আশেপাশে তাকিয়ে কেবল পাহাড়ের বিস্তরণ দেখা যাচ্ছে। দু পাশেই পাহাড় আর মাঝখানের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলছে। আমি মাথা ব্যথা নিয়ে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে মনটাকে ডাইবার্ট করার ভীষণ চেষ্টা করলাম। কিন্তু ব্যর্থ হলাম। সাবিরা আমাকে নিয়ে বেশ চিন্তিত। এখন কেন জানি না সাবিরাকে আমার নেতিবাচক কিছু মনে হচ্ছে না৷ বরং মনে হচ্ছে সে আমার অস্বস্তিটা বুঝতে পেরে সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছে। তবুও কেন জানি না বিশ্বাসটা মনে আসতেছে না৷ মনে হচ্ছে আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়ের দিকে আমি এগুচ্ছি। 
এসব ভাবতে ভাবতেই গাড়িটা থেমে গেল। সন্ধ্যা নেমে এসেছে অনেক আগেই৷ চারদিকটা অন্ধকার। তুশবা গাড়িটা থামার সাথে সাথে আমার আর আমার হাসবেন্ডকে বলল
"আমাদের কিছু পথ হেঁটে যেতে হবে। পাহাড়ি এলাকা তো আমাদের বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার জন্য প্রশস্ত রাস্তা নেই৷ তাই সরু পথটুকু হেঁটে যেতে হবে। গাড়ির ড্রাইভার এখান থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে উল্টোপথে ৫ কি:মি যাবে। এরপর একটা গ্যারেজে গাড়ি রেখে পরদিন রওনা দিবে। আর আমাদের এক সপ্তাহ পর নিতে আসবে। এ জায়গা থেকে দিনের বেলা ছোটো ছোটো টমা পাওয়া গেলেও এখন রাত হয়ে যাওয়ায় পাওয়া যাবে না।"
নির্ঝর কৌতুহলী গলায় জিজ্ঞেস  করল
"টমা কী?"
তুশবা হেসে উত্তর দিল
"টমা হলো ছোটো সাইকেলের মতো কাঠের গাড়ি। পাহাড়ি সরু রাস্তা পার হতে ব্যবহার করা হয়। কাল সকালে আপনাকে দেখাব ভাইয়া৷"
নির্ঝর প্রতি উত্তরে বলল
"এতগুলো ব্যাগ নিয়ে এ মুহুর্তে  কি ১ কি:মি হাঁটা সম্ভব? সবার কষ্ট হয়ে যাবে না? আর আমরা তো অভ্যস্ত না৷ এর মধ্যে আপনার ভাবী জার্নি করে সিক হয়ে আছে। ও একা শরীর নিয়ে হাঁটতে পারে কি'না সন্দেহ।"
তুশবা চিন্তিত গলায় উত্তর দিল
"এখন এ ছাড়া উপায় নেই। তারপরও আমি একটা চেষ্টা করছি। আমার ছোটো ভাইকে বলতেছি  তার টমাটা নিয়ে এসে অন্তত ব্যাগ গুলো নিয়ে যেতে। এরপরও কষ্ট করে হেঁটেই যেতে হবে। সে এলকায় একমাত্র আমার ছোটো ভাইয়েই মোবাইল চালায়। সে সে ফোন চার্জ দিতে তাকে ১০ কি:মি পথ পার হয়ে লোকালয়ের একটা বাজারে যেতে হয়। নেট সবসময় পাওয়া যায় না তবুও মাঝে মাঝে যতটুকু পায় তা দিয়ে চলে যায়। আতীর গ্রামটা অনেক ভেতরে। আর ভাবী আপনি নাকি ভাইয়াকে বলতেছিলেন গুগলে এ নামের সন্ধান খুঁজে পাননি। পাবেনেই বা কীভাবে? এটা বান্দরবানের একদম ভেতরে অবস্থিত। বান্দরবনের অনেকেই এ গ্রামের নাম জানে না। এখানে ছোটো একটা জনগোষ্ঠীর বাস। এখানের মানুষ বাইরে খুব একটা যায় না। আর শিক্ষার আলো এখানে এখনও পৌঁছায়নি ঠিক করে। আমি ছোটো থেকে একটু অন্যরকম ছিলাম। তাই পড়াশোনার পেছন ছুটতে ছুটতে ঢাকা পর্যন্ত গিয়েছি, চাকুরি নিয়েছি। সাবিরাও আমার লেজ ধরে একই পথের পথিক। যাইহোক অনেক কথা বলে ফেললাম। আমি আমার ভাই মান্দিকে কল দিয়ে বলতেছি আসার জন্য।"
তুশবা তার ভাইকে কল দিয়ে বলল টমা নিয়ে আসতে। আমরা গাড়িতে বসেই অপেক্ষা  করতে লাগলাম। সাবিরা গাড়ি থেকে নামল। আর নির্ঝর আমার পাশে আরও ঘেষে বসলো। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস  করল
"তোমার কী এখনও মাথা ব্যথা করছে।"
নির্ঝরের কথার কোনো উত্তর আমি দিতে পারছিলাম না। নির্ঝরকে ট্রিপের প্রথম থেকেই মনে হচ্ছিল আমার ব্যাপারে বেখেয়ালি। একবার অজ্ঞান  হয়ে যাওয়ার পরও সে ঠিক করে আমার পাশে বসেনি। আমার ব্যাপারে একদম উদাসীন ছিল। তাই কিছুটা অভিমান আর শারিরীক দুর্বলতায় আমি কোনো উত্তরেই দিতে পারছিলাম না। চুপ করে চোখটা বন্ধ করে রইলাম। মাথাটা বেশ ঝিমঝিম করতে লাগল। একদমই ভালো লাগছে না। ১ কি:মি পথ কীভাবে হাঁটব সে চিন্তায় করছিলাম।  এ পাহাড়ি অন্ধকার পথ হাঁটার শক্তি আমার হবে ত?  এ ভাবনায় আমাকে চিন্তিত করে তুলছে।  
মিনিট পনেরোর মধ্যেই একজন আসলো। হাতে হারিকেনের মতো কিছু একটা নিয়ে। তুশবা জানাল এটা তার ভাই মান্দি। তার ভাই সাইকেলের মতো সরু তিন চাকা ওয়ালা একটা কাঠের বাহনে করে এসেছে। এ বিশেষ বাহনকেই টমা বলে তারা। তাদের এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছায় নি। তাই তারা প্রাকৃতিক উপায়ে একটা জ্বালানি ব্যবহার করে। জ্বালানীটা তারা জঙ্গলের একটা ফল, নাম ইশবা, যেটা অনেকটা নারিকেলের মতো শক্ত। সেটাকে আকৃতি দিয়ে সে জ্বালানিটা সেটার মধ্যে নিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। আর তাতে একটা গাছের শিকড় দিয়ে বেঁধে হাতে করে নিয়ে বহন করে। এ জ্বালানীটার পরিমাণ তাদের জানা। সেজন্য যে জায়গায় যায় সে জায়গার সময় অনুমান করে সে পরিমাণ জ্বালানি নিয়ে আগুন জ্বালায়। এ জ্বালানীটাকে তারা ডাব্বা বলে ডাকে। 
মান্দি আসার সাথে সাথে আমরা সবাই গাড়ি থেকে নামি। মান্দি, নির্ঝর আর আমাকে মাথা নীচু করে কুর্নিশের মতো করে হাতে একটা বিশেষ সাইন দেখাল। ডান হাতের আঙ্গুলটাকে  সে কিছুটা পদ্মের কলির মতো করে সাইনটা দেখাল। তুশবার বর্ণণায় এটা হলো তাদের সম্মান প্রদর্শন। কোনো অতিথি আসলে তারা এভাবেই সম্মান প্রদর্শন করে। এ সম্মান প্রদর্শনের ধরণকে তাদের ভাষায় বিমোহশিয়া বলে। মোহশিয়া দেবীর নামকরণে এ নাম করা হয়েছে। তারা একজন বিশেষ দেবীর পূজা করে। তাদের নিজস্ব আলাদা ধর্ম আছে। আর সে ধর্মের নাম মোহমাতাদ্রি। আর সে ধর্মের দেবীর নাম মোহশিয়া৷ 
যাইহোক প্রসঙ্গে আসি। মান্দি আমাদের ব্যাগগুলো তার টমায় বেঁধে সে বাহন নিয়ে রওনা দিয়ে দিয়েছে। গাড়ির ড্রাইভারও গাড়ি ঘুরিয়ে ফেলেছে। এখন আমরা চারজন কেবল দাঁড়িয়ে আছি। তুশবা তার মোবাইলের টর্চটা জ্বালিয়ে আমাদের সবাইকে বলল
"আমার পিছু পিছু হাঁটবেন। আমার মোবাইলের টর্চ বন্ধ হয়ে গেল অন্যদের ফোনের জ্বালাবেন। এভাবেই হাঁটতে হবে। আস্তে করে হাঁটলেও ৩০-৪৫ মিনিট সময় লাগবে। আমরা চেষ্টা করব একটু দ্রূত হাঁটতে।"
তুশবার কথা  মতো আমরা হাঁটতে লাগলাম।।চারশপাশটা থমথমে। পাহাড়ের ভেতর থেকে জ/ন্তু, জা/নোয়ারের ডাক ধেয়ে আসছে। গরমেও শীত শীত ভাব। ভীষণ ভয় লাগছিল সে সাথে শরীর দুর্বল। তবুও হাঁটছিলাম। নির্ঝর আমার হাতটা ধরে অনেকটা টেনে টেনেই হাঁটছে বলা যায়। কিছু পথ হাঁটার পর তুশবার ফোনের টর্চ বন্ধ হয়ে গেল। সাথে সাথে একটা ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হলাম।

5. 
#পর্ব- ৫
 তুশবার ফোনের টর্চ বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে আমাদের ফোনও বন্ধ হয়ে গেল। কারও ফোনেই যেন অন হচ্ছে না। বুঝতে পেরেছি আমাদের সবার ফোনের চার্জ একসাথেই শেষ হয়েছে। অনেকটা সময় পার হয়েছে এ সময় ফোনের চার্জ থাকবে না,  এটাই স্বাভাবিক৷  আমার গা,  হাত, পা কাঁপতে লাগল। মনে হচ্ছে কোনো ভূতের অন্ধকার গলিতে আমরা আটকে আছি। তুশবা আমাদের উদ্দেশ্য করে বলল
"অন্ধকার পথে হাঁটা ছাড়া কোনো উপায় নেই। আমরা একে অপরের কাঁধে হাত ধরে ধরে লাইন করব। সবার প্রথমে আমি মাঝখানে আপনারা দুজন।  সবার শেষে সাবিরা। এভাবে লাইন করে আমরা এগুতে থাকব।  আমার এ পথে অন্ধকারেও হেঁটে অভ্যাস আছে৷ সাবিরারও অভ্যাস আছে। আপনাদের দুজনের সমস্যা হতে পারে। তাই মাঝখানে রাখলাম। আর আরেকটা কথা। অনেক কিছুর আওয়াজ কানে আসতে পারে। যেহেতু গহীন জঙ্গল।  সেহেতু জা/নোয়ারের হাক ডাক বেশি। ভয় পাবেন না আপনারা।"
তুশবার কথা মতো আমরা কাঁধে হাত রেখে সারিবদ্ধ হয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে হাঁটছি। হাঁটতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তবুও হাঁটতে হচ্ছে। এমন ভয়ংকর, অস্বস্থিকর ট্রিপ আমার জীবনে এ প্রথম। নির্ঝরের জোরাজোরিতে এসেছি। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে কোনো শয়তান আমাদের বশ করছে। বেশ মাতাল মাতাল লাগছে। হঠাৎ  করে মনে হলো কেউ আমার নিতম্বে সুচের মতো কিছু একটা দিয়ে গুতা দিয়েছে৷ আমি একটু চেঁচিয়ে উঠলাম। সাবিরা আমাকে বলে উঠল
"কী হয়েছে ভাবী? আপনার শরীর ঠিক তো? কষ্ট কী বেশি হচ্ছে?"
নির্ঝর আর তুশবাও একইসাথে জিজ্ঞেস  করে উঠল কী হয়েছে? আমি কিছুটা চেপে গেলাম বিষয়টা। স্বাভাবিক  গলায় বললাম
"মনে হলো কিছু একটা পায়ে লেগেছে। তেমন কিছু না। তবে আর কত পথ বাকি?"
তুশবা দম ছেড়ে জবাব দিল
"এই তো আর বেশি সময় না। ১০ মিনিটের মতো লাগবে।"
আমার কাছে এ ১০ মিনিট সময়ও অনেক বেশি লাগছে। মনে হচ্ছে এ সময় টা এত আস্তে যাচ্ছে কেন। মাতাল মাতাল লাগছে। অসাড় লাগছে। হাঁটতে হাঁটতেই কখন যে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম খেয়াল নেই। যখন জ্ঞান  ফিরে তখন চারদিকে আলো ফুটেছে। আমি বাশের মাচায় শুয়ে আছি। মাটি থেকে একটু উঁচুতে বাশের মাচা করে দুটো ঘর করা এর সামনে বারান্দার মতো করে খোলা জায়গা।  এখানে আমাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। আমার জ্ঞান  ফিরতেই নির্ঝর বলে উঠল
"তোমার শরীর কী ঠিক হয়েছে? অন্ধকারে তোমাকে তিনজন মানুষ কোনোরকম কোলে করে এখানে নিয়ে এসেছি। এতক্ষণ  তুমি ঘুমাচ্ছিলে৷ ডাক দিলে সারা দিচ্ছিলে কিন্তু চোখ খুলে উঠছিলে না৷ তুমি ঘুমের ঔষধ বা কিছু খেয়েছো? মাথা ব্যথার জন্য খেতেও পারো।"
আমি হালকা গলায় বললাম
"আমাকে আগে একটু পানি দাও।"
তুশবার ভাই মান্দি আমাকে একটা বিশেষ পাত্রে পানি এনে দিল। পাত্রটা দেখতে অনেকটা নৌকার মতো। পাত্রটা কাঠ দিয়ে বানানো। আমি পানিটা খেয়ে একটু নিঃশ্বাস নিয়ে উত্তর দিলাম
"কিছুই খাইনি৷ হয়তো শরীর দুর্বল তাই। এখন একটু ভালো লাগছে। আমার প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে৷ কিছু খেতে চাই৷ "
সাবিরা আমার কথা শুনার সাথে সাথে আমার জন্য একটা বিশেষ রকমের শুটকি ভর্তা,  পাহাড়ি মুরগি, দিয়ে ভাত নিয়ে আসলো। তাদের রান্নায় কোনো ধরণের মসলা নেই। তবে আমি খেয়ে এটা বুঝেছি ভীষণ ঝাল। ভাতটা খাওয়ার পর আমার শরীরে একটু শক্তি পেতে লাগলো৷ চারপাশে তাকিয়ে আমার মনটা এবার জুড়িয়ে গেল। মনে হলো আমি এ জায়গায় এসে ভুল করিনি। এত নিরিবিলি  সুশীতল বাতাস আমাকে যেন মুগ্ধই করছে। এবার অনেকটা ভালো লাগছে আমার। তুশবা আর সাবিরার প্রতি যে সন্দেহটা ছিল সেটাও কেটে গেছে কিছুটা। আমি চারপাশ তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। সাবিরা আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলল
"ভাবী আপনার তো অনেক কিছু নিয়ে নেগেটিভিটি মনে ছিল। সেটা কী এখন কেটেছে? আমাদের সংস্কৃতি ভিন্ন। তবে আমরা মানুষ। আমাদের মানবিকতা আছে। আমাদের আতীরের মানুষের আপ্যায়ন আপনি কোনোদিন ভুলবেন না। আমরা অতিথি আপ্যায়নে সেরা। আমার মোহশিয়া দেবীর পূজারি। আমাদের দেবীর কুটুম বাড়ি এ আতীর। তাই আতীরের মানুষ কুটুমদের অনেক যত্ন করে৷ আপনি আতীরকে আজীবন মনে রাখবেন। আমরা কারও ক্ষতি করি না। বরং সবার মঙ্গল হয় এমন কাজ করি৷ "
আমি সাবিরাকে হালকা জড়িয়ে ধরে বললাম
"আমার এরকম দ্বিধা দ্বন্ধের জন্য আমি দুঃখিত।"
তুশবা তার মা, বাবার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল। যদিও তাদের কথা আমরা বুঝি না। তবুও হাসি মুখ দেখে বুঝেছিলাম আমরা আসাতে তারা খুশি। আমি কিছুটা উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। ওদের একটা বদ্ধ জায়গায় আমাকে একটা মটকায় করে পানি আর মগ দিল গোসল করার জন্য। আমি সেখানে গেলাম ফ্রেশ হতে। কিন্তু আমার বার বার মনে হচ্ছিল কেউ আমাকে অনুসরণ করছে। বদ্ধ জায়গাটা নারিকেল পাতা দিয়ে বেতের মতো করে বুনে তৈরী করা হয়েছে। আমি সেটার ফাঁক দিয়ে বারবার তাকিয়ে খেয়াল করছিলাম কে লক্ষ্য করছে। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। আমি তাড়াহুড়ো  করে গোসল সেড়ে কাপড় পাল্টানোর সময় লক্ষ্য করলাম কেউ একজন পাশ থেকে সরে গেল। আমি এবার ফাঁকা দিয়ে তাকিয়ে লক্ষ্য করলাম একটা মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম এটা সাবিরা। আমার মাথায় এবার প্রশ্ন জাগতে শুরু করল। সাবিরা এখানে কী করছিল? লুকিয়ে লুকিয়ে সে কী দেখছিল? আমার ভেতরে থাকা সন্দেহ যেন আরও ঝেঁকে বসলো। 
আমি কাপড় পাল্টিয়ে তাড়াহুড়ো করে বের হলাম। তুশবাদের ঘরের সামনে এসে লক্ষ্য করলাম সাবিরা মাচায় বসে আছে। সে আমার সাথে এমন ভাব করছে যেন সে এতক্ষণ  এখানেই বসে ছিল। বিষয়টি বুঝতে পেরেও আমি চুপ থাকলাম। এত সহজে এখানের কাউকে বিশ্বাস করা যাবে না৷ এতে আমার বিপদেই চলে আসতে পারে৷ তবে সন্দেহটাও প্রকাশ করা যাবে না। সাবিরাকে চোখে চোখে রাখতে হবে। 
সে সময়ের পর থেকে সাবিরা শুধু আমার আশেপাশে থাকে। যত্নের নাম করে সে যে আমার বিষয়ে বেশি কৌতুহল দেখাচ্ছে এটা বুঝায় যাচ্ছে। আমি বিষয়টিতে বিরক্ত হলেও নিজেকে সংযত করলাম। 
সারাদিন আমরা চারজন আশেপাশে ঘুরলাম। বেশ মনোরম পরিবেশ। এ সৌন্দর্যতায় যে কেউ মুগ্ধ হবে৷ তবে আমি যে পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম সাবিরা বারবার নির্ঝর কে আমার কাছ থেকে সরিয়ে আমার সাথে হাঁটছিল। আমি স্পষ্ট নির্ঝর আর সাবিরার মধ্যে কিছু কানেক্ট করতে পারছিলাম। তবে সেটা কী বুঝতে পারছিলাম না। 
সারাদিন ঘুরে আমরা যখন ঘরে আসি। তখন তুশবা আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসে। আমাদের সামনে থরে থরে সাজানোর হয় তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো৷ তুশবা আমাদের জানায় এখানে যা আছে আমাদের জন্য হালাল। সে আসার আগে মুসলিমদের জন্য হালাল কোনটা জেনেই এসেছে। তাই যে ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো আমাদের জন্য হালাল সেটাই রান্না করা হয়েছে। খাবারগুলো দিয়ে তুশবা নির্ঝর আর আমাকে বলল আমরা যেন নিজ হাতে নিয়ে খাই। তারাও আমাদের সাথে বসলো। আমরা খাওয়ার শুরু করলাম৷ প্রতিটা খাবার অনেক সুস্বাদু ছিল। নির্ঝর পাহাড়ি মুগির রানের পিসটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল
"এটা খাও। এ তরকারিটা অনেক অনেক মজা হয়েছে।"
আমার পাতে রানের পিসটা দেওয়ার সাথে সাথে সাবিরা সেটা আমার পাত থেকে নিয়ে বলল
"ভাবী এটার থেকে এ পুঁটি মাছের মারচা টা অনেক মজা। এটা খেয়ে দেখেন।"
তার এমন আচরণে আমরা তিনজনেই বেশ হতবাক। আর আমি এটা বুঝতে পারছিলাম সাবিরা আর নির্ঝরের মাঝে কিছু চলছে যেটা এতদিন আমার চোখ আড়াল করে গেছে৷ আর এ বিষয়টি আরও বেশি পরিষ্কার হয়েছিল পরদিনের একটা অদ্ভুত  ঘটনায়।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.